কুত্তার বাচ্চা প্রসঙ্গ
রাজিবের সাথে আমার প্রথম দেখা আজিমপুর কবরস্থানের সামনের ফুটপাতে। সে একমনে ফুটপাতের পাশের ড্রেনের দিকে তাঁকিয়ে আছে। তার আশেপাশে কে আসছে যাচ্ছে সেদিকে তার মনোযোগ নাই। আমি একটা মালব্রো ধরিয়েছি। সিগারেট হাতে থাকলে মানুষের সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আশেপাশে কেউ নাই কথা বলার মত। আমি রাজিবের সাথে কথা বলার জন্য এগিয়ে গেলাম।
- ড্রেনে কি হইসে ভাইজান?
রাজিব আমার দিকে না তাঁকিয়ে আমুদে গলায় বলল, "কুত্তার বাচ্চা"।
আমি চমকে উঠে পালটা গালি দিতে যাবো, তার আগেই সে ফট করে ড্রেনের উপর বসে পড়ে হাত বাড়িয়ে একটা ছোট কুকুরের বাচ্চাকে টেনে তুলল।
-ওহ... শিট। সে আসলে কুত্তার বাচ্চাকে টেনে তোলার জন্যই ড্রেনের পাশে এতক্ষন ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। আমার দিকে তাঁকিয়ে সে বিজয়ীর হাসি দিল একটা। আমি এইরকম সুন্দর হাসি খুব কম মানুষেরই দেখেছি।
ঘাড় ধরে সে কুকুরের বাচ্চাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তার পিছু নিলাম। এইরকম ক্যারেক্টার সমাজে দূর্লভ। একটু সামনেই সিটি কর্পোরেশনের একটা কল আছে। সেখানে গিয়ে আচ্ছামত পানি দিয়ে ধুয়ে নিল বাচ্চাটাকে।
এরপর আবার ফুটপাতে নামিয়ে রেখে দিল বাচ্চাটাকে। কইত্থেকে জানি এখন আরো দুটো কুকুর এসে জুটেছে। এরা সমানে লেজ নাড়ছে।
রাজিব নির্বিকার। স্কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে আবার হাঁটা শুরু করল। আমি পিছু নিলাম। মনে হচ্ছে হন্টন পীরের পেছনে হাঁটছি।
- ঘটনা কি? আপনি পিছে পিছে আসেন কেন?
- এমনেই... কিছু করার নাই। দেখি আপনি কি করেন?
- মানে? আপনে কে?
- আমি মানুষ। খুব খারাপ মানুষ। ভালো মানুষ দেখলে তার পিছে পিছে যাই।
- আমি ভালো মানুষ?
- ভালো খারাপ জানি না, তবে আপাতত এই রাস্তায় আপনি সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং মানুষ।
রাজিব আবার তার সেই ভুবন ভোলানো নিষ্পাপ হাসি দিল।
- চা খাবেন ভাইজান?
আমি সম্মতি দিলাম। গল্প জমানোর জন্য চা অনেক উত্তম একটা পানীয়। গলা পরিষ্কার করে, কথা ঠিকমত বলা যায়।
গল্পে গল্পে তার নাম পরিচয় জানলাম। সে পেশায় একজন ইলেক্ট্রিশিয়ান। কোথাও চাকরি করে না তবে নন-পার্মানেন্ট হিসেবে একটা সরকারি অফিসে যুক্ত আছে। মাসে নয় হাজার টাকার মত পায়। বাইরে কাজ করে কিছু টু-পাইস ইনকাম হয়। আর মাঝে মধ্যে সুযোগ পেলে স্টোরের পুরাতন মালামাল বিক্রি করে দেয়। এই দিয়ে জোড়াতালির মত চলছে।
- নিজেই একটা অফিস খুলে বসেন না। নাম দেন "ইলেক্ট্রিক ম্যান" ।
নামটা মনে হয় রাজিবের বিশেষ পছন্দ হয় নাই। সে সুরু চোখে আমার দিকে তাঁকায়।
- ভাইজান কি মশকরা করেন? গরীবের সাথে অবশ্য সবাই মজা নেয়।
- না মজা নিচ্ছি না, সিরিয়াসলি বলতেসি। একটা অফিস নেন, সার্ভিসের চার্ট বানান। আমি মার্কেটিং করে দিব। ক্লায়েন্ট জোগাড় করে দিব। বিজনেসে যা প্রফিট হবে তার ১০% কমিশন আমার।
- আপনে দালালি করবেন?
- দালালি না, মার্কেটিং। যেহেতু খরচ দিতে পারবেন না, তাই কমিশন নিব। দরকারে দোকানে কিছু মালামালও তুলব। নবাবপুরে আমার পরিচিত পাইকার আছে। বাকিতে লাখখানেক টাকার মাল দেবে।
প্রথম পরিচয়ে এত সুবুদ্ধি রাজিব আশা করে নাই। সে ব্যাপক সন্দিহান হয়ে আমার দিকে তাঁকাচ্ছে। আমি তাকে আমার ফোন নাম্বার দিয়ে বিদায় নিলাম।
জানি সে একদিন না একদিন ফোন দিবে। তাকে তার বর্তমান অবস্থা থেকে উন্নত হবার বুদ্ধি দিসি। এইটা চিন্তা-ভাবনা করা মত সময় দরকার তার।
তাই বইলা আবার ভাইবেন না আমি জনে জনে উপদেশ বিলি করে বেড়াই। রাজিবকে আমার পছন্দ হইসে কারন খুব কম মানুষই ড্রেনের থেকে কুত্তার বাচ্চা তুলে তাকে গোসল করায়!


